৩. বিভিন্ন ধর্মে তালাক

বিভিন্ন ধর্মে তালাক

ইহুদীদের নিকটে তালাক :

ইহুদীদের নিকটে কোন ওযর ছাড়াই স্ত্রীকে তালাক দেওয়া চলে। তবে এটাকে তারা ভালো মনে করে না।া তাদের নিকটে ওযর বা ত্রুটি দু’ধরনের: (ক) দেহগত ত্রুটি। যেমন চোখে কম দেখা, চোখ টেরা হওয়া, মুখ দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া, পিঠ কুঁজো হওয়া, ল্যাংড়া হওয়া, বন্ধ্যা হওয়া ইত্যাদি। (খ) চরিত্রগত ত্রুটি। যেমন বেশরম হওয়া, বাজে বক বক করা, অপরিচ্ছন্ন থাকা, কৃপণ ও কঠোর প্রকৃতির হওয়া, অবাধ্য হওয়া, অপচয়কারিণী হওয়া, পেটুক হওয়া, পেট মোটা বা ভুঁড়িওয়ালী হওয়া, খাদ্যলোভী হওয়া, তুচ্ছ বিষয়ে গর্বকারিণী হওয়া ইত্যাদি। তবে যেনা হ’ল তাদের নিকটে সবচেয়ে বড় ত্রুটি। এজন্য কেবল যেনার প্রচার হওয়াই যথেষ্ট। প্রমাণের দরকার নেই। পক্ষান্তরে স্বামীর যত ত্রুটিই থাকুক না কেন, স্ত্রী তার কাছ থেকে তালাক নিতে পারে না। এমনকি যদি স্বামীর যেনা প্রমাণিত হয়, তবুও নয়।

খৃষ্টানদের নিকটে তালাক :

খৃষ্টান মাযহাবগুলির মধ্যে প্রধান হ’ল তিনটি: ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও প্রটেষ্ট্যানট। ক্যাথলিক মাযহাবে তালাক একেবারে নিষিদ্ধ। স্ত্রী চরিত্রে অবিশ্বাস বা খেয়ানত জনিত কারণ ঘটলে তাদের বিছানা পৃথক রাখা হয় এবং এভাবে তিলে তিলে কষ্ট দেওয়া হয়। তবুও তালাকের মাধ্যমে উভয়ে পৃথক হয়ে যায় না। একাধিক বিবাহ খৃষ্টান ধর্মীয় গাম্ভীর্যের বিরোধী। কেননা ইনজীল মারকুস-এর কথিত ৮ ও ৯ আয়াতের বর্ণনা মতে ‘স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে একটি দেহ। … অতএব আল্লাহ যাদেরকে একত্রিত করেছেন, মানুষ তাদেরকে পৃথক করতে পারে না’ (يكون الإثنان جسدا واحدا…فالذى جمعه الله لايفرقه إنسان) খৃষ্টানদের বাকী দু’টি মাযহাবে সীমিত কয়েকটি ক্ষেত্রে তালাক সিদ্ধ। যার প্রধান হ’ল পারস্পরিক অবিশ্বাস বা খেয়ানত। কিন্তু এই অবস্থায় তাদের মধ্যে তালাক সিদ্ধ হ’লেও স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্য দ্বিতীয় বিবাহ নিষিদ্ধ।

 

জাহেলী যুগের তালাক :

প্রাক-ইসলামী যুগে জাহেলী আরবে নারীদের নির্যাতন করার জন্য তালাককে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হ’ত। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, একজন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দিত। আবার ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নিত। এইভাবে শতাধিকবার তালাক ও রাজ‘আতের ঘটনা ঘটত। কখনো কোন স্বামী বলে বসতো, আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে কখনোই তালাক দিব না, ঘরে আশ্রয়ও দেব না। স্ত্রী বলত, সেটা কিভাবে সম্ভব? স্বামী বলত, তোমাকে তালাক দিব। তারপর ইদ্দত শেষ হবার আগেই ফিরিয়ে নেব। আবার তালাক দেব। আবার ফিরিয়ে নেব। এভাবেই চলবে। তোমাকে শান্তিতে থাকতেও দেব না, যেতেও দেব না। এই ঘটনা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জানানো হ’লে তিনি চুপ থাকেন। অতঃপর দরসের আলোচ্য আয়াত ‘তালাক মাত্র দু’বার’… নাযিল হয়। অর্থাৎ মাত্র দু’বারই তালাক দিয়ে ফেরত নেওয়া যাবে। তৃতীয় বারে আর নয়। তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।[1]

হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন, দ্বিতীয় স্বামী কৃর্তক স্বেচ্ছায় তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার পূর্বতন স্বামীর নিকটে ফিরে আসার অনুমতি প্রদান আল্লাহর পক্ষ থেকে মহিলাদের প্রতি একটি বড় ধরনের অনুগ্রহ। কেননা তাওরাতের বিধান মতে সে আর বিবাহ করতে পারে না। ইনজীলের বিধান মতে তাদের মধ্যে স্থায়ীভাবে তালাক নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের শরী‘আত বান্দার কল্যাণ বিচারে পূর্ণাংগ ও স্থিতিশীল। ফলে ঐ স্বামীকে চতুর্থবারের সুযোগ দিয়েছে’। অর্থাৎ সে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে বিদায় করার পরে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করলেও সেই স্বামী কর্তৃক স্বেচ্ছায় তালাকপ্রাপ্তা হ’লে পুনরায় পূর্ব স্বামী তাকে গ্রহণ করতে পারে’। তবে কোন কৌশলের আশ্রয় নিলে দ্বিতীয় স্বামী ‘ভাড়াটে ষাঁড়’ হবে (ইবনু মাজাহ, সনদ হাসান)।  তাদের ঐ বিয়ে বাতিল হবে এবং প্রথম স্বামীর জন্য তা হালাল হবে না।[2]


[1]. সাইয়িদ সাবিক্ব, ফিক্বহুস সুন্নাহ (কায়রো : ১৪১২/১৯৯২) ২/২৮০-৮২ পৃঃ।

[2]. ছালেহ বিন ফাওযান, আল-মুলাখখাছুল ফিক্বহী (দার ইবনুল জাওযী, ৫ম মুদ্রণ ১৪১৭/১৯৯৬), পৃঃ ৩১৭-১৮।

Advertisements
This entry was posted in 03. বিভিন্ন ধর্মে তালাক. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s