ধর্মীয় ভিত্তি

ধর্মীয় ভিত্তি

মানুষ যে এত পয়সা ও সময় ব্যয় করে, এর অন্তর্নিহিত প্রেরণা নিশ্চয়ই কিছু আছে। মোটামুটি দু’টি ধর্মীয় আক্বীদাই এর ভিত্তি হিসাবে কাজ করে থাকে। ১- ঐ রাতে বান্দাহর গুনাহ মাফ হয়। আগামী এক বছরের জন্য ভালমন্দ তাক্বদীর নির্ধারিত হয় এবং এই রাতে কুরআন নাযিল হয়। ২- ঐ রাতে রূহগুলি ছাড়া পেয়ে মর্ত্যে নেমে আসে। মোমবাতি, আগরবাতি, পটকা ও আতশবাজি হয়তো বা আত্মাগুলিকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবার জন্য করা হয়। হালুয়া-রুটি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ঐদিন আল্লাহর নবী (ছাঃ)-এর দান্দান মুবারক ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। ব্যথার জন্য তিনি নরম খাদ্য হিসাবে হালুয়া-রুটি খেয়েছিলেন বিধায় আমাদেরও সেই ব্যথায় সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য হালুয়া-রুটি খেতে হয়। অথচ ওহোদের যুদ্ধ হয়েছিল ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসের ১১ তারিখ শনিবার সকাল বেলায়।৩

৩. বায়হাক্বী, দালায়েলুন নবুঅত (বৈরুতঃ ১৯৮৫) ৩য় খন্ড, পৃঃ ২০১-২।

আর আমরা ব্যথা অনুভব করছি তার প্রায় দু’মাস পূর্বে শা‘বানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে…! এক্ষণে আমরা উপরোক্ত বিষয়গুলির ধর্মীয় ভিত্তি কতটুকু তা খুঁজে দেখব। প্রথমটির সপক্ষে যে সব আয়াত ও হাদীছ পেশ করা হয় তা নিম্নরূপঃ ১- সূরা দুখান-এর ৩ ও ৪ নং আয়াত-

إِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِى لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِيْنَ- فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍحَكِيْمٍ-

অর্থঃ (৩) আমরা তো ইহা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে; আমরা তো সতর্ককারী (৪) এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়’।৪ হাফেয ইবনে কাছীর (৭০১-৭৭৪ হিঃ) স্বীয় তাফসীরে বলেন, ‘এখানে মুবারক রজনী অর্থ লায়লাতুল ক্বদর’। যেমন সূরায়ে ক্বদর ১ম আয়াতে আল্লাহ বলেন,إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِىْ لَيْلَةٍ الْقَدْرِ-   অর্থঃ ‘নিশ্চয়ই আমরা ইহা নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে’। আর সেটি হ’ল রামাযান মাসে। যেমন সূরা বাক্বারাহর ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন,شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْآنُ،   অর্থঃ ‘এই সেই রামাযান মাস যার মধ্যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’। এক্ষণে ঐ রাত্রিকে মধ্য শা‘বান বা শবেবরাত বলে ইকরিমা প্রমুখ হ’তে যে কথা বলা হয়ে থাকে, তা সঙ্গত কারণেই অগ্রহণযোগ্য। এই রাতে এক শা‘বান হ’তে আরেক শা‘বান পর্যন্ত বান্দার রূযী, বিয়ে-শাদী, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ হয় বলে যে হাদীছ প্রচারিত আছে, তা ‘মুরসাল’ ও যঈফ এবং কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহের বিরোধী হওয়ার কারণে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, ক্বদর রজনীতেই লওহে মাহফূযে সংরক্ষিত ভাগ্যলিপি হ’তে পৃথক করে আগামী এক বছরের নির্দেশাবলী তথা মৃত্যু, রিযিক ও অন্যান্য ঘটনাবলী যা সংঘটিত হবে, সেগুলি লেখক ফেরেশতাগণের নিকটে প্রদান করা হয়। এরূপভাবেই বর্ণিত হয়েছে হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর, মুজাহিদ, আবু মালিক, যাহ্হাক প্রমুখ সালাফে ছালেহীনের নিকট হ’তে’।৫

৪. অনুবাদঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ঢাকাঃ ৭ম মুদ্রণ, ১৯৮৩), পৃঃ ৮১৪।

৫. তাফসীরে ইবনে কাছীর (বৈরুতঃ ১৯৮৮) ৪র্থ খন্ড পৃঃ ১৪৮।

অতঃপর ‘তাক্বদীর’ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হ’ল-

وَكُلُّ شَىْءٍ فَعَلُوْهُ فِى الزُّبُرِ-  وَكُلُّ صَغِيْرٍ وكَبِيْرٍ مُسْتَطَرٌ-

অর্থঃ ‘উহাদিগের সমস্ত কার্যকলাপ আছে আমলনামায়, আছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সমস্ত কিছুই লিপিবদ্ধ।৬ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন-

عن عبد الله بن عمرو قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كَتَبَ اللهُ مَقاديرَ الَخلآئِقِ قبلَ أن يَخْلُقَ السماواتِ والأرضَ بخمسينَ ألفِ سنَةٍ…

অর্থঃ ‘আসমান সমূহ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বৎসর পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় মাখলূক্বাতের তাক্বদীর লিখে রেখেছেন।৭ হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমার ভাগ্যে যা আছে তা ঘটবে; এবিষয়ে কলম শুকিয়ে গেছে’ (পুনরায় তাক্বদীর লিখিত হবে না)।৮ এক্ষণে শবেবরাতে প্রতিবছর ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয় বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তার কোন ছহীহ ভিত্তি নেই। বরং ‘লায়লাতুল বারাআত’ বা ভাগ্যরজনী নামটিই সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইসলামী শরী‘আতে এই নামের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাকী রইল এই রাতে গুনাহ মাফ হওয়ার বিষয়। সেজন্য দিনে ছিয়াম পালন ও রাতে ইবাদত করতে হয়। অন্তত ১০০ রাক‘আত ছালাত আদায় করতে হয়। প্রতি রাক‘আতে সূরায়ে ফাতিহা ও ১০ বার করে সূরায়ে ইখলাছ তথা ‘ক্বুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ’ পড়তে হয়। এই ছালাতটি গোসল করে আদায় করলে গোসলের প্রতি ফোঁটা পানিতে ৭০০ রাক‘আত নফল ছালাতের ছওয়াব পাওয়া যায় ইত্যাদি।

এ সম্পর্কে প্রধান যে তিনটি দলীল দেওয়া হয়ে থাকে, তা নিম্নরূপঃ

১- হযরত আলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন-

إذا كانت ليلةُ النصفِ من شعبانَ فقوموا ليلَها وصوموا نهارَها الخ

অর্থঃ  ‘অর্ধ  শা‘বান  এলে  তোমরা  রাত্রিতে ইবাদত  কর ও দিনে ছিয়াম

৬. সূরায়ে ক্বামার ৫২ ও ৫৩ আয়াত।

৭. মুসলিম, মিশকাত হা/৭৯।

৮. বুখারী, মিশকাত হা/৮৮; মিশকাত (দিল্লীঃ ১৩৫০ হিঃ), পৃঃ ২০।

পালন কর। কেননা আল্লাহ পাক ঐদিন সূর্যাস্তের পরে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন ও বলেন, আছ কি কেউ ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করে দেব; আছ কি কেউ রূযী প্রার্থী আমি তাকে রূযী দেব। আছ কি কোন রোগী আমি তাকে আরোগ্য দান করব’।৯

এই হাদীছটির সনদে ‘ইবনু আবী সাব্রাহ’ নামে একজন রাবী আছেন, যিনি হাদীছ জালকারী। সে কারণে হাদীছটি মুহাদ্দেছীনের নিকটে ‘যঈফ’।

দ্বিতীয়তঃ হাদীছটি ছহীহ হাদীছের বিরোধী হওয়ায় অগ্রহণযোগ্য। কেননা একই মর্মে প্রসিদ্ধ ‘হাদীছে নুযূল’ ইবনু মাজাহর ৯৮ পৃষ্ঠায় মা আয়েশা (রাঃ) হ’তে (হা/১৩৬৬) এবং বুখারী শরীফের (মীরাট ছাপা ১৩২৮ হিঃ) ১৫৩, ৯৩৬ ও ১১১৬ পৃষ্ঠায় এবং ‘কুতুবে সিত্তাহ’ সহ অন্যান্য হাদীছ গ্রন্থে সর্বমোট ৩০ জন ছাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।১০ সেখানে ‘মধ্য শা‘বান’ না বলে ‘প্রতি রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশ’ বলা হয়েছে। অতএব ছহীহ হাদীছ সমূহের বর্ণনানুযায়ী আল্লাহপাক প্রতি রাত্রির তৃতীয় প্রহরে নিম্ন আকাশে অবতরণ করে বান্দাকে ফজরের সময় পর্যন্ত উপরোক্ত আহবান করে থাকেন- শুধুমাত্র নির্দিষ্টভাবে মধ্য শা‘বানের একটি রাত্রিতে নয়।

২- মা আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদা রাত্রিতে একাকী মদীনার ‘বাক্বী’ গোরস্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক পর্যায়ে আয়েশা (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন, মধ্য শা‘বানের দিবাগত রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং ‘কল্ব’ গোত্রের ছাগল সমূহের লোম সংখ্যার চাইতে অধিক সংখ্যক লোককে মাফ করে থাকেন’।১১ এই হাদীছটিতে ‘হাজ্জাজ বিন আরত্বাত’ নামক একজন রাবী আছেন, যার সনদ ‘মুনক্বাত্বা’ হওয়ার কারণে ইমাম বুখারী প্রমুখ মুহাদ্দিছগণ হাদীছটিকে ‘যঈফ’ বলেছেন।

৯. ইবনু মাজাহ (দিল্লীঃ ১৩৩৩ হিঃ) ১ম খন্ড, পৃঃ ১০০; ঐ (বৈরুতঃ মাকতাবা ইল্মিয়াহ, তাবি) হা/১৩৮৮।

১০. হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম, মুখতাছার ছাওয়াইকুল মুরসালাহ (রিয়াযঃ তাবি), ২য় খন্ড, পৃঃ ২৩০-৫০। হাদীছটি নিম্নরূপঃ-

يَنْزِلُ ربُّنا تبارك وتعالى كلَّ ليلة الى السماء الدنيا حين يَبقِى ثُلُثُ الليلِ الآخرُ فيقولُ مَنْ يدعونى فاستجيب له، من يسألُنى فاُعطيَه، من يستغفرنى فاَغفِرَله رواه البخارى وفى رواية لمسلم عنه  فلايزال كذلك حتى يُضىءً الفجرُ،  صحيح مسلم ط/بيروت ح/৭৫৮-

১১. ইবনু মাজাহ ১ম খন্ড, পৃঃ ১০০; ঐ (বৈরুতঃ তাবি) হা/১৩৮৯; তিরমিযী হা/৭৩৬।

প্রকাশ থাকে যে, ‘নিছফে শা‘বান’-এর ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে কোন ছহীহ মরফূ হাদীছ নেই। তবে বিভিন্ন দুর্বল সূত্রে কয়েকটি যঈফ ও জাল হাদীছ প্রচলিত আছে। যেমন (১) তিরমিযী ও ইবনু মাজাহ্তে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত অত্র হাদীছটি দুইস্থানে ছিন্নসূত্র বা ‘মুনক্বাত্বা’ (২) আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত বায়হাক্বীর অপর একটি রেওয়ায়াত ‘মুরসাল’ (৩) আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) বর্ণিত ইবনু মাজাহর একটি রেওয়ায়াত ‘যঈফ’ (৪) ইবনু ওমর (রাঃ) বর্ণিত মুসনাদে আহমাদ-এর অন্য একটি রেওয়ায়াত দুর্বল (ليّن )। (৫) কাছীর বিন মুররাহ্ (রাঃ) বর্ণিত বায়হাক্বীর রেওয়ায়াতটি ‘মুরসাল’ (৬) আলী (রাঃ) বর্ণিত ইবনু মাজাহ ও তিরমিযীর ‘রাত্রিতে ইবাদত ও দিবসে ছিয়াম’-এর প্রসিদ্ধ হাদীছটি যঈফ ও মওযূ।১২ আলবানী বলেন, (واهٍ جدا ) ‘দারুন বাজে’।১৩ অতএব এসবের উপর ভিত্তি করে কোন ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা চলে না।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উক্ত রাতের জন্য পৃথক কোন ইবাদত বা ছালাত আদায় করলেন না, দিবসে ছিয়াম পালন করলেন না, কাউকে কিছু করতেও বললেন না। ছাহাবায়ে কেরামও এই রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন ইবাদত, গোর যেয়ারত বা অন্য বাড়তি কিছু করেছেন বলে জানা যায় না। তবে আমরা কার সুন্নাতের অনুসরণ করছি?

৩- ইমরান বিন হুছাইন (রাঃ) বলেন যে, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জনৈক ব্যক্তিকে বলেন যে, তুমি কি ‘সিরারে শা‘বানের’ ছিয়াম রেখেছ? লোকটি বললেন ‘না’। আল্লাহর নবী (ছাঃ) তাকে রামাযানের পরে ছিয়াম দু’টির ক্বাযা আদায় করতে বললেন’।১৪

জমহূর বিদ্বানগণের মতে ‘সিরার’ অর্থ মাসের শেষ। উক্ত ব্যক্তি শা‘বানের শেষাবধি নির্ধারিত ছিয়াম পালনে অভ্যস্ত ছিলেন অথবা ঐটা তার মানতের ছিয়াম ছিল। রামাযানের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলার  নিষেধাজ্ঞা১৫  লংঘনের ভয়ে

১২. তিরমিযী, তুহফাতুল আহওয়াযী সহ (কায়রোঃ ১৯৮৭) ৩য় খন্ড, পৃঃ ৪৪১-৪৪।

১৩. মিশকাত (বৈরুতঃ ১৯৮৫) হা/১৩০৮-এর টীকা, ১ম খন্ড, পৃঃ ৪১০।

১৪. মুসলিম নববীসহ (লাক্ষ্ণৌঃ নওল কিশোর ছাপা ১৩১৯ হিঃ) ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৬৮।

১৫. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৯৭৩।

তিনি শা‘বানের শেষের ছিয়াম দু’টি বাদ দেন। সেকারণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে ঐ ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করতে বলেন।১৬ বুঝা গেল যে, এই হাদীছটির সঙ্গে প্রচলিত শবেবরাতের কোন সম্পর্ক নেই।

Advertisements

About ইসলামী সাইট

কুরআন ও সহীহ হা‌দিস
This entry was posted in 01. শবেবরাত, 03. ধর্মীয় ভিত্তি. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s